ইলিশের স্বাদে ও গল্পে ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকার দ্য গ্রেট হিলশা ফেস্টিভ্যাল
শেয়ার করুন
ফলো করুন

ইলিশের সঙ্গে বাঙালির সম্পর্কটা কেবল রসনার নয়। এই রুপালি মাছের গায়ে জড়িয়ে আছে নদীর গল্প, বর্ষার গন্ধ, মায়ের রান্নাঘর, পারিবারিক আড্ডা, উৎসবের আয়োজন আর শৈশবের অসংখ্য স্মৃতি। ইলিশ বাঙালির খাবারের গল্পটাকেও তাই একটু অন্য রকম করে তোলে। সেই আবেগ, ঐতিহ্য আর স্বাদের উদ্‌যাপনেই তৃতীয়বারের মতো ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকায় ৯ সেপ্টেম্বর শুরু হয়েছে ‘দ্য গ্রেট হিলশা ফেস্টিভ্যাল ২০২৬’। চলবে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।

ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকার এলিমেন্টস গ্লোবাল ডাইনিংয়ে উৎসবের উদ্বোধনী সন্ধ্যা ছিল সরগরম। একদিকে ইলিশের নানা পদ, অন্যদিকে বাংলাদেশের খাবার ও সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা—সব মিলিয়ে সন্ধ্যাটি পরিণত হয়েছিল স্বাদ ও গল্পের এক মেলবন্ধনে।
ইলিশকে ঘিরে এমন আয়োজনের আবেদনই আলাদা। কারণ, ইলিশের স্বাদ যতটা জিবে থাকে, তার চেয়ে অনেক বেশি জায়গা করে নেয় স্মৃতিতে। কারও কাছে শর্ষে ইলিশ মানেই মায়ের হাতের রান্না, কারও কাছে পান্তার সঙ্গে ইলিশ ভাজা মানেই বর্ষার দুপুর। আবার কারও কাছে পদ্মা, মেঘনা কিংবা নদীর ঘাটের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক চিরচেনা বাংলাদেশ।

উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সেই সাংস্কৃতিক সম্পর্কের কথাই উঠে আসে বারবার। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া, ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকার জেনারেল ম্যানেজার ডেভিড ও’হ্যানলন, ফুড অ্যান্ড বেভারেজ ম্যানেজার অলিভিয়ের লোরো, মার্কেটিং বিভাগের সাদমান সালাউদ্দিন, নিমফিয়া পাবলিকেশনের প্রকাশক করুণাংশু বড়ুয়া, এক্সিকিউটিভ ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর আনিসুজ্জামান সোহেল, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক শামসাদ মোর্তুজা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল ঢাকা স্ট্রিমের সম্পাদক ও প্রকাশক গোলাম ইফতেখার মাহমুদসহ হোটেলের কর্মকর্তা ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা।

বিজ্ঞাপন

ইলিশের গল্প এবার বইয়ের পাতায়

এবারের উৎসবের উল্লেখযোগ্য সংযোজন ইলিশকে নিয়ে প্রকাশিত বই ‘আ ফিশ কলড ইলিশ’। উদ্বোধনী সন্ধ্যায় আনুষ্ঠানিকভাবে বইটির মোড়ক উন্মোচন করা হয়। নিমফিয়া পাবলিকেশনের এই প্রকাশনায় ইলিশকে দেখা হয়েছে আরও বিস্তৃত পরিসরে। খাবারের প্লেট ছাড়িয়ে ইলিশের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সংস্কৃতি, ইতিহাস, সমাজ ও বাঙালির জীবনযাপনের নানা প্রসঙ্গ তুলে ধরার চেষ্টা রয়েছে বইটিতে।

বইটির সঙ্গে যুক্ত অধ্যাপক শামসাদ মোর্তুজা অনুষ্ঠানে ইলিশকে সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে বইটি নিয়ে দীর্ঘদিনের কাজের গল্প। প্রায় পাঁচ বছর আগে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ অবশেষে বইয়ের রূপ পেয়েছে। ফলে ইলিশ নিয়ে আয়োজিত উৎসবের সঙ্গে বইটির প্রকাশ যেন আয়োজনটিকে দিয়েছে পূর্ণতা।

একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে যখন রান্না, সংস্কৃতি ও সাহিত্য একই জায়গায় এসে দাঁড়ায়, তখন আয়োজনটি আর শুধু খাদ্য উৎসব থাকে না; হয়ে ওঠে ঐতিহ্যকে নতুন করে দেখার একটি উপলক্ষ। অধ্যাপক শামসাদ মোর্তুজার বক্তব্যে উঠে আসে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই বহুল প্রচলিত উদ্ধৃতিও—বাঙালিকে চেনার একটি উপায় হলো, সে ইলিশ মাছের কাঁটা কতটা দক্ষতার সঙ্গে বাছতে পারে। রন্ধনশিল্পের সঙ্গে সাহিত্যের এই সংযোগই এবারের আয়োজনকে দিয়েছে অন্য মাত্রা।

বিজ্ঞাপন

চেনা ইলিশের অচেনা স্বাদ

ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকার ডিরেক্টর অব ফুড অ্যান্ড বেভারেজ অলিভিয়ের লোরোর বক্তব্যেও ছিল অতিথিদের ভালোবাসার কথা। আগের দুই আয়োজনের সাড়া এবং অতিথিদের আগ্রহ থেকেই এবারও উৎসবটি আয়োজন করা হয়েছে। আর এক্সিকিউটিভ শেফ জুলিয়ান শীতল বটলেরুর পরিকল্পনায় ইলিশ পরিবেশিত হচ্ছে অন্য রকমভাবে।

বুফেতে গিয়ে তাই শুধু একটি বা দুটি পরিচিত ইলিশ পদেই থেমে থাকার সুযোগ নেই। শর্ষে ইলিশ, ইলিশ পোলাও, ইলিশ দোপেয়াজি, ইলিশ পাতুরি, ইলিশ–নারকেল কোরমা, ইলিশ তন্দুরি, ইলিশ মুড়িঘন্ট ও ইলিশ ভর্তার মতো পরিচিত পদগুলোর পাশাপাশি আছে স্মোকড ইলিশ নিগিরি, ভলকানো ইলিশ সুশি, ইলিশ পিৎজা, ইলিশ স্টাফড ব্রেড ও ইলিশ স্যাভরি টার্টলেটের মতো ভিন্নধর্মী পরিবেশনা।

বাঙালির চেনা ইলিশকে কখনো ঐতিহ্যবাহী স্বাদে, কখনো অন্য রূপে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে একই মাছের স্বাদ কখনো ফিরিয়ে দেবে ঘরের রান্নার স্মৃতি, আবার কখনো নিয়ে যাবে একেবারেই নতুন স্বাদের অভিজ্ঞতায়।

শুধু ইলিশ নয়

ইলিশের উৎসব হলেও পুরো বুফেটি শুধু ইলিশনির্ভর নয়। যাঁরা মাছের চেয়ে অন্য খাবার বেশি পছন্দ করেন, তাঁদের জন্যও রয়েছে নানা আয়োজন। মাটন কাচ্চি বিরিয়ানি, বিফ কালাভুনা, মেজবানি বিফ, মাটন নেহারি, বিভিন্ন ধরনের ভর্তা, শুঁটকি, চিংড়িসহ দেশি-বিদেশি নানা পদ থাকছে বুফেতে।

ফলে একই টেবিলে কেউ ইলিশের পাতে ডুবে যেতে পারবেন, আবার কেউ বেছে নিতে পারবেন নিজের পছন্দের অন্য খাবার। এই বৈচিত্র্যই আয়োজনকে করে তুলেছে আরও পারিবারিক। কারণ, খাবারের উৎসবের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলোর একটি হলো একই টেবিলে ভিন্ন পছন্দের মানুষদের একসঙ্গে বসা।

কেউ শর্ষের ঝাঁজ খুঁজবেন, কেউ ইলিশ পাতুরির ভেতরের নরম মাংস, আবার কেউ হয়তো কাচ্চির প্লেট নিয়েই সন্তুষ্ট থাকবেন। পাশে চলবে গল্প, হাসি আর গান। সন্ধ্যার লাইভ মিউজিক সেই পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করবে। খাবারের স্বাদ ও সুরের সঙ্গে মিলিয়ে তাই একটি দীর্ঘ সন্ধ্যা কাটানোর সুযোগ থাকছে অতিথিদের জন্য।

স্বাদের সঙ্গে দায়িত্বের কথাও

ইলিশের গল্পে আনন্দের পাশাপাশি দায়িত্বের কথাটিও গুরুত্বপূর্ণ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া ইলিশের উৎপাদন ও সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন। বিশেষ করে জাটকা না ধরার বিষয়ে জেলে, ব্যবসায়ী, পরিবহনকারী ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

কারণ, আজকের ছোট ইলিশই ভবিষ্যতের বড় ইলিশ। নদীতে মাছের প্রজনন ও উৎপাদন ঠিক না থাকলে একসময় আমাদের প্রিয় এই মাছই হয়ে উঠতে পারে আরও দুর্লভ। এই জায়গায় এসে ইলিশ উৎসবের অর্থটাও আরও বড় হয়ে যায়। একটি মাছকে ভালোবাসা মানে শুধু তার স্বাদ উপভোগ করা নয়, তার ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবা। যে মাছকে ঘিরে বাঙালির এত স্মৃতি, সেই মাছকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্বও তাই আমাদের।
‘দ্য গ্রেট হিলশা ফেস্টিভ্যাল ২০২৬’ শেষ পর্যন্ত শুধু একটি বুফে আয়োজন নয়।

এখানে একটি মাছকে ঘিরে একসঙ্গে এসেছে রান্না, সংস্কৃতি, সাহিত্য, স্মৃতি এবং ভবিষ্যতের ভাবনা। প্লেটে যখন ইলিশ আসবে, তখন তার সঙ্গে আসবে বাংলাদেশের নদীর গল্পও। আর ‘আ ফিশ কলড ইলিশ’ বইটি সেই গল্পকে খাবারের টেবিলের বাইরে নিয়ে যাবে আরও কিছু দূর।

প্রতিদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত চলবে এই বিশেষ বুফে ডিনার। মূল্য প্রত্যেকজন ১১ হাজার টাকা নেট। নির্বাচিত ব্যাংক কার্ডে রয়েছে ‘বাই ওয়ান গেট থ্রি’ সুবিধা। আর আইএইচজি ওয়ান রিওয়ার্ডসের সদস্য হলে ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকা এবং অংশগ্রহণকারী আইএইচজি হোটেলস অ্যান্ড রিসোর্টসে খাবার ও পানীয়তে ২৫ শতাংশ ছাড়ের সুযোগ থাকছে।

ছবি: ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকা

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩: ০৮
বিজ্ঞাপন