কসমেটিকা ঢাকা ২০২৬: ১৬ দেশের অংশগ্রহণে সৌন্দর্যশিল্পের মিলনমেলা
শেয়ার করুন
ফলো করুন

সৌন্দর্যের সংজ্ঞা বদলেছে, বদলেছে সৌন্দর্যচর্চার ধরনও। একসময় যেখানে প্রসাধনী মানেই ছিল সাজগোজের কয়েকটি পরিচিত পণ্যমাত্র, এখন সেখানে স্কিনকেয়ার, হেয়ার কেয়ার, ব্যক্তিগত পরিচর্যা, হাইজিন ও সুগন্ধি—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে বিশাল এক বাজার। বাংলাদেশের ভোক্তাদের মধ্যেও এসব পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। সেই সম্ভাবনার দুয়ার আরও বড় করতে রাজধানীতে শুরু হয়েছে ‘কসমেটিকা ঢাকা ২০২৬’।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর কুড়িলে ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরার (আইসিসিবি) নবরাত্রি হলে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের প্রসাধনী ও ব্যক্তিগত পরিচর্যা পণ্যের এমন প্রদর্শনী এবার দ্বিতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

প্রথম দিনেই সৌন্দর্যশিল্পের এই আয়োজন ঘিরে নানা বয়সী দর্শনার্থীর ভিড় দেখা যায়। কোথাও নতুন স্কিনকেয়ার পণ্যের প্রদর্শন, কোথাও মেকআপ ও হেয়ার কেয়ারের নানা সম্ভার; আবার কোনো স্টলে চলছে পণ্যের সরাসরি ব্যবহার দেখানো, কোথাও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা। দেশি–বিদেশি ব্র্যান্ড, উদ্যোক্তা, প্রস্তুতকারক ও সরবরাহকারীদের সরব উপস্থিতিতে সকাল গড়াতেই প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে পুরো প্রদর্শনী।

বিজ্ঞাপন

পণ্যের সঙ্গে সরাসরি অভিজ্ঞতা

কসমেটিকা ঢাকার আকর্ষণ শুধু স্টলে সাজানো পণ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে লাইভ ডেমো, বিউটি কনসালটেশন ও স্কিনকেয়ার বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার সুযোগ। কোন পণ্যের ব্যবহার কীভাবে, কোনটি কার জন্য উপযোগী—এসব নিয়েও সরাসরি জানা যাচ্ছে।

অন্যদিকে উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের জন্য রয়েছে নেটওয়ার্কিংয়ের সুযোগ। নতুন পণ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে ব্যবসায়িক যোগাযোগ, অংশীদারত্ব ও ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রও।

বিজ্ঞাপন

এক ছাদের নিচে ১৬ দেশের অংশগ্রহণ

কসমেটিকা ঢাকায় সৌন্দর্যচর্চার পুরো পরিসরই এক ছাদের নিচে। স্কিনকেয়ার, হেয়ার কেয়ার, মেকআপ, ফ্র্যাগরেন্স, গ্রুমিং ও হাইজিন পণ্যের পাশাপাশি রয়েছে উৎপাদন প্রযুক্তি, প্যাকেজিং, সরবরাহব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সেবা।

বাংলাদেশের পাশাপাশি কোরিয়া, থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, সিঙ্গাপুর, চীন, হংকং, জাপান, ভারতসহ ১৬টি দেশের ব্র্যান্ড, প্রস্তুতকারক, সরবরাহকারী, খুচরা বিক্রেতা ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অংশ নিয়েছেন।

ফলে প্রদর্শনীটি শুধু নতুন পণ্য দেখার জায়গা নয়; বরং দেশি–বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরিরও সুযোগ করে দিচ্ছে।

এবার লক্ষ্য ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’–এর পরের ধাপ

কসমেটিকা ঢাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জায়গাটি সম্ভবত এখানেই, বাংলাদেশের এই বড় বাজারকে কীভাবে উৎপাদন ও রপ্তানির শক্তিতে রূপ দেওয়া যায়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানান, ‘আমাদের তৈরি পোশাকশিল্পে যে উৎপাদন সক্ষমতা, কমপ্লায়েন্স অবকাঠামো, দক্ষ জনবল ও বৈশ্বিক ক্রেতা–সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, সেটিকে কাজে লাগিয়ে কসমেটিকস খাতেও কন্ট্র্যাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিং, ফর্মুলেশন, বিশেষায়িত প্যাকেজিং, মানসম্পন্ন ল্যাবরেটরি ও সার্টিফিকেশনের সুবিধা গড়ে তোলা সম্ভব। একই সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে সার্টিফায়েড বোটানিক্যাল ও হারবাল উপাদানের একটি শক্তিশালী সরবরাহব্যবস্থা তৈরি করা গেলে এই খাত শুধু অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা পূরণ করবে না; বরং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের নতুন রপ্তানি সম্ভাবনার দ্বার খুলবে।’

শুধু পণ্য তৈরি নয়, দেশের ভেতরেই ফর্মুলেশন, গবেষণা ও ব্র্যান্ডিংয়ের সক্ষমতা তৈরির ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তাঁর ভাষায়, ‘সরকারের দৃষ্টিতে এই শিল্পের পরবর্তী ধাপ হলো “মেইড ইন বাংলাদেশ” থেকে “ফরমুলেটেড, ডেভেলপমেন্ট এবং ব্র্যান্ডিং ইন বাংলাদেশ”–এর দিকে এগিয়ে যাওয়া। এর জন্য বিনিয়োগ সহজীকরণ, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরীক্ষা ও সার্টিফিকেশন, মেধাস্বত্ব সুরক্ষা, টেকসই প্যাকেজিং এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, নিরাপদ কাঁচামাল ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে আমরা যদি একটি সমন্বিত শিল্পভিত্তি তৈরি করতে পারি, তাহলে কসমেটিকস ও পারসোনাল কেয়ার খাত আগামী দিনে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কূটনীতির নতুন শক্তিশালী ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।’

স্থানীয় ব্র্যান্ডের সামনে বড় সুযোগ

বাংলাদেশের বাজারে এখন শুধু বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য নেই। স্থানীয় উদ্যোক্তারাও কসমেটিকস, টয়লেট্রিজ ও ব্যক্তিগত পরিচর্যা পণ্যের বাজারে নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছেন। বাড়ছে পণ্যের বৈচিত্র্য, উন্নত হচ্ছে প্যাকেজিং ও উৎপাদনের প্রক্রিয়া, আর প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনে বিনিয়োগও ধীরে ধীরে বাড়ছে।

বাংলাদেশ ইন্ডেন্টিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএএ) সভাপতি বাহারুল মনসুর বলেন, ‘কসমেটিকস ও পারসোনাল কেয়ার খাতে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি প্রতিবছরই বাড়ছে। এই খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ ইন্ডেন্টিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন। কসমেটিকা ঢাকা থেকে আমরা চাই আরও বেশি বিনিয়োগ আসুক এবং খাতটি আরও বাড়ুক।

’ সেনসেস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের সিনিয়র পারফিউমার ফ্রাংক কেন্টনের চোখেও বাংলাদেশের বাজারটি সম্ভাবনাময়। তিনি বলেন, ‘আমি ৪০ বছর ধরে বাংলাদেশে কাজ করছি। একটি সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম। তবে অবশ্যই সে জন্য মানসম্পন্ন পণ্য তৈরি করতে হবে, তবে সেটা যেন ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে।’ অন্যদিকে মানসম্পন্ন পণ্য ও ভোক্তা সচেতনতার জায়গাটিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সাচিরোম লিমিটেডের পরিচালক ধ্রুব অরোরা।

বাজারের চেয়ে বড় হয়ে উঠছে সম্ভাবনা

এই শিল্পে সম্ভাবনা শুধু প্রসাধনী তৈরিতে সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় কাঁচামাল উৎপাদন, আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি, গবেষণা ও উন্নয়ন, মান নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং ও রপ্তানিমুখী উৎপাদন—সব ক্ষেত্রেই বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল ও প্রয়োজনীয় উপকরণ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে একদিকে যেমন আমদানিনির্ভরতা কমবে, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আসবে। আর আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে পারলে দেশের বড় ভোক্তা বাজারের পাশাপাশি আঞ্চলিক বাজারেও তৈরি হতে পারে রপ্তানির নতুন পথ।

স্কোয়াডমাইন্ড গ্লোবাল লিমিটেডের সিইও এস এম ফয়সাল মুনিমের প্রত্যাশাও তেমন। তিনি বলেন, ‘কসমেটিকা ঢাকা ২০২৬ আয়োজন থেকে আমাদের প্রত্যাশা, এই খাতে দেশি–বিদেশি আরও বেশি বিনিয়োগ হবে। এটা এই খাতের একটা ক্রসম্যাচিং প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে।’

তাই কসমেটিকা ঢাকা ২০২৬–কে শুধু সৌন্দর্যপণ্যের প্রদর্শনী বললে হয়তো পুরো ছবিটা ধরা পড়ে না। এর ভেতরে রয়েছে একটি দ্রুত বেড়ে ওঠা বাজার, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সম্ভাবনা, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের সুযোগ এবং উৎপাদন থেকে রপ্তানির দিকে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন। সৌন্দর্যপণ্যকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই আয়োজন শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য নতুন দুয়ারও খুলে দিতে পারে।

৩ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া ‘কসমেটিকা ঢাকা ২০২৬’ চলবে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে এই আয়োজন। আয়োজনটি করেছে স্কোয়াডমাইন্ড গ্লোবাল লিমিটেড। এবারের আয়োজনের মিডিয়া পার্টনার হিসেবে রয়েছে আগামীর সময়, প্রতিদিনের বাংলাদেশ, বাংলা ভিশন, বাংলানিউজ২৪ ডটকম ও বাংলা টেলিগ্রাফ। স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হাল ফ্যাশন।

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০: ১৯
বিজ্ঞাপন