
বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব) আয়োজিত বাংলাদেশ ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ফেয়ার (বিটিটিএফ) ২০২৫। রাজধানীর বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ কনফারেন্স সেন্টারে তিন দিনের এই আয়োজনে দেশ-বিদেশের ১২০টির বেশি সংস্থা অংশ নেয়। প্রায় ২২০টি স্টল ও ২০টি প্যাভিলিয়নে প্রদর্শিত হয় পর্যটন–সংশ্লিষ্ট পণ্য ও সেবা, ছিল বিশেষ অফার।

মেলার উদ্বোধন করেন প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী। তিনি বলেন, বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পকে এগিয়ে নিতে সরকারি–বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
টোয়াবের সভাপতি রাফেউজ্জামান জানান, টোয়াব ১৩ বছর ধরে আন্তর্জাতিক ট্যুর অপারেটরদের সঙ্গে বাংলাদেশের পর্যটন খাতের সেতুবন্ধন তৈরি করছে।
এবারের মেলায় অংশ নেয় পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, চীন, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন ও তুরস্কের ট্যুরিজম সংস্থা ও অপারেটররা। প্রবেশপথ থেকেই দর্শনার্থীদের স্বাগত জানায় বান্দরবান, রাঙামাটি, সুন্দরবন ও সেন্ট মার্টিনের বড় বড় ভিজ্যুয়াল ডিসপ্লে। প্রতিটি স্টল ছিল নিজস্ব সংস্কৃতি ও থিমে সাজানো, যা পুরো মেলাকে এক আন্তর্জাতিক ভ্রমণ উৎসবে পরিণত করে।

টোয়াবের বাণিজ্য ও মেলার পরিচালক তাসলিম আমিন শোভন বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা। এই মেলা দেশি অপারেটরদের বিদেশি নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত করছে।’
তাসলিম আমিন শোভন আরও জানান, বিদেশি অতিথিদের জন্য সুন্দরবনে বিশেষ ভ্রমণের আয়োজন করা হয়, যাতে তারা বাংলাদেশের প্রকৃতি ও সংস্কৃতি কাছ থেকে অনুভব করতে পারেন।

নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের জনসংযোগ বিভাগের পরিচালক সুনীল শর্মা বলেন, ‘বাংলাদেশি পর্যটকেরা অত্যন্ত আন্তরিক ও অতিথিপরায়ণ। বাংলাদেশ-নেপাল যৌথভাবে টেকসই পর্যটনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।’

প্রথমবারের মতো অংশ নেয় পাকিস্তানের ভিস্তা ট্যুরিজম। প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী বিলাল বলেন, ‘পাকিস্তান ভ্রমণে বাংলাদেশিদের কোনো বাধা নেই। বরফঢাকা পর্বত থেকে মরুভূমি—প্রকৃতির বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ আমাদের দেশ ভ্রমণকারীদের জন্য এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা তৈরি করে।’
মেলায় বিভিন্ন ট্যুর অপারেটর কোম্পানি ও এয়ারলাইনস দিচ্ছিল আকর্ষণীয় ছাড়। আকাশবাড়ি হলিডেজ ও রূপকথা ট্যুরস দিয়েছে ৫১ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়। টার্কিশ এয়ারলাইনস তাদের প্রথম অংশগ্রহণেই ঘোষণা করে ১৫ শতাংশ ছাড়। এ ছাড়া এয়ার এশিয়া, শ্রীপার্ট হোটেল এবং একাধিক রিসোর্টও দেয় বিশেষ অফার।

নতুন সংযোজন ছিল আকিজ এয়ারের আত্মপ্রকাশ। এটা আকিজ রিসোর্সের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত একটি পূর্ণাঙ্গ ট্রাভেল ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি। করপোরেট সেলস প্রধান গোলাম রাফাত বলেন, ‘টিকিট, হোটেল বুকিং, ভিসা প্রসেসিং ও আন্তর্জাতিক ট্যুর—সবকিছুতেই আমরা নির্ভরযোগ্য সেবা দিতে চাই।’

তিন দিনের এই মেলায় দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল উপচে পড়া। গত শুক্রবার ছিল সবচেয়ে জনসমাগমপূর্ণ দিন। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মেলা চললেও শেষ সময় অনেক স্টলে দীর্ঘ লাইন পড়ে। মেলায় ছিল র্যাফেল ড্র, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কান্ট্রি প্রেজেন্টেশন, সেমিনার, বিটুবি সেশন এবং বিকাশ ক্যাশব্যাক অফার।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম করপোরেশনের ডেপুটি ম্যানেজার শংকর কুমার মজুমদার জানান, করপোরেশনের ১৮টি মোটেলকে আরও জনপ্রিয় করতে প্রচারণা জোরদার করা হচ্ছে।

এ আয়োজনের মাধ্যমে শুধু ভ্রমণপ্রেমীরা নন, ব্যবসায়ী ও আন্তর্জাতিক ট্যুর অপারেটররাও পাচ্ছেন পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘বিটিটিএফ বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে পরিচিত করছে এবং দেশের ‘গ্রিন পাসপোর্ট’-এর ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল করছে।’
বাংলাদেশ ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ফেয়ার ২০২৫ প্রমাণ করেছে—বাংলাদেশ শুধু ভ্রমণের গন্তব্য নয়, বরং এক উন্মুক্ত সম্ভাবনার দেশ। দেশি-বিদেশি অংশগ্রহণ, রঙিন আয়োজন ও বিপুল দর্শক সমাগম প্রমাণ করে বাংলাদেশে পর্যটনের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল ও আশাব্যঞ্জক।
ছবি: হাল ফ্যাশন ও আয়োজক