‘সংকলন’: প্রিন্টে ফিরে দেখা ভাষা আন্দোলনের সাত দশক
শেয়ার করুন
ফলো করুন

২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় প্রদর্শনীর উদ্বোধন অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শিল্পী সব্যসাচী হাজরা, নাট্যজন শংকর সাঁওজাল, আলোকচিত্রী আবির আব্দুল্লাহসহ সংস্কৃতিমনা দর্শকেরা।

স্বাগত বক্তব্যে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকার পরিচালক ফ্রাসোয়াঁ শামব্র স্মরণ করিয়ে দেন, নিজ মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠায় একটি জাতিকে রক্ত দিতে হয়েছে। ১৯৫২ সালের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি এসেছে। তিনি বলেন, এই ইতিহাস সংরক্ষণ ও প্রজন্মান্তরে পৌঁছে দিতে বাংলাদেশের পত্রপত্রিকা ও সাময়িকীগুলোর ভূমিকা অপরিসীম; ‘সংকলন’ সেই মুদ্রিত উত্তরাধিকারকেই সামনে নিয়ে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

মুদ্রিত পৃষ্ঠায় ভাষা আন্দোলনের দীর্ঘ যাত্রা

প্রদর্শনীর মূল উপাদান হিসেবে রয়েছে সাত দশকের বেশি সময় ধরে একুশকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত ম্যাগাজিন, সাহিত্য সাময়িকী, পুস্তিকা ও ছোট বই। দেশজ ও লোকজ মুদ্রিত সাহিত্য ও লেখনীর ভেতর দিয়ে এখানে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে নতুনভাবে অনুসন্ধান করা হয়েছে। সংবাদপত্র ও সাময়িকীগুলো কীভাবে জনস্মৃতি নির্মাণ করেছে এবং সময়ের সঙ্গে ভাষা আন্দোলনের ভিজ্যুয়াল ও পাঠ্য ভাষা কীভাবে রূপান্তরিত হয়েছে, তারই দলিল এই আয়োজন।

মূল আর্কাইভ উপকরণ ও নির্বাচিত পুনর্মুদ্রণের মাধ্যমে দর্শক দেখতে পারবেন, দৈনন্দিন মুদ্রণপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই ইতিহাস কীভাবে নথিবদ্ধ, বিস্তৃত ও জীবন্ত থেকেছে। প্রদর্শনীতে আর্কাইভাল প্রিন্ট থেকে অনুপ্রাণিত নতুন পোস্টকার্ড ও পোস্টারও যুক্ত হয়েছে। ফলে ‘সংকলন’ কেবল স্মৃতিচারণা নয়, ইতিহাসের সঙ্গে সমকালীন সংলাপেরও একটি পরিসর তৈরি করেছে।

একুশের ইতিহাসে আমরা দেখি—রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র বরকত, প্রেস ব্যবসায়ীর ছেলে রফিক, কেরানি শফিউর, পিওন সালাম, রিকশাচালক আউয়াল, রাজমিস্ত্রি অহিউল্লাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ভাষার মর্যাদার প্রশ্নে জীবন দিয়েছেন। তাঁদের আত্মত্যাগ শুধু ভাষা রক্ষার আন্দোলন ছিল না; বরং তা বাংলাভাষী মানুষের আর্থসামাজিক উত্তরণ ও আত্মপরিচয়ের সংগ্রামের ভিত্তি গড়ে দেয়। পূর্ব পাকিস্তানে ভাষা-রাজনীতির মাধ্যমে বাংলাভাষীদের জাতিসত্তা খর্ব করার যে প্রয়াস ছিল, তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। মাতৃভাষার অপমানের ঐতিহাসিক প্রতিক্রিয়াই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের পথ তৈরি করে।

এই ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত মুদ্রণ ঐতিহ্যও।
এই ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত মুদ্রণ ঐতিহ্যও।

এই ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত মুদ্রণ ঐতিহ্যও। একুশের সংকলনগুলো উচ্চাঙ্গ নন্দনতত্ত্বের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে নিজস্ব ভাষা ও নকশায় দেশজ প্রকাশভঙ্গি নির্মাণ করেছে। ভাষাকে প্রান্তিক করে রাখার প্রচেষ্টা অসংখ্য মানুষের জীবন-জীবিকায় আঘাত হেনেছিল। শহীদ রফিকউদ্দিন আহমদ—যাঁর পারিবারিক পেশা ছিল ছাপাখানা—মুদ্রণসংস্কৃতি ও ভাষাসংগ্রামের সেই নিবিড় সম্পর্কেরই এক প্রতীক।

বিজ্ঞাপন

কিউরেটরের দৃষ্টিভঙ্গি

 কিউরেটর অনিন্দ্য রহমান
কিউরেটর অনিন্দ্য রহমান

প্রদর্শনীর কিউরেটর অনিন্দ্য রহমান ঢাকাভিত্তিক শিল্পী, কিউরেটর ও পরীক্ষামূলক চলচ্চিত্র নির্মাতা। চলমান চিত্র, মুদ্রণমাধ্যম ও কিউরেটরিয়াল চর্চায় বিস্তৃত তাঁর কাজের কেন্দ্রে রয়েছে ‘ফ্লিটিং কমন্স’ বা ক্ষণস্থায়ী সামূহিকতার ধারণা—প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে গড়ে ওঠা অস্থায়ী সামাজিক ও দৃশ্যগত পরিসর তাঁর শিল্পচিন্তার প্রধান অনুসন্ধান। ‘সংকলন’ তাঁর আয়োজিত চতুর্থ প্রদর্শনী।

খণ্ডাংশ, আর্কাইভ ও বিচ্ছিন্ন জনস্মৃতি নিয়ে দীর্ঘদিনের গবেষণার একটি সম্প্রসারিত রূপ এটি। ফলে প্রদর্শনীটি কেবল নথির সমাহার নয়; বরং জনগণের যৌথ মালিকানা ও জনমানুষের সংস্কৃতির শিল্পভিত্তিক পুনর্নির্মাণ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। অনিন্দ্য রহমান জানান, গত তিন দশকে একুশকে ঘিরে স্মারক প্রকাশনার ধারায় কিছুটা ভাটা পড়লেও একুশের চেতনা থেমে নেই; বরং এই প্রদর্শনী প্রশ্ন তোলে—আমরা কি ধীরে ধীরে মুদ্রিত পৃষ্ঠা থেকে দূরে সরে যাচ্ছি, নাকি নতুন মাধ্যমে নতুনভাবে ফিরে আসছে সেই উত্তরাধিকার?

‘সংকলন’ প্রদর্শনী চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত। স্থান আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকা, ধানমন্ডির গ্যালারি জুম। দর্শনার্থীদের জন্য সময় প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত (রোববার বন্ধ)।

এই প্রদর্শনীর উপরি পাওনা হলো লেটার প্রেস থেকে বর্তমানের অত্যাধুনিক ছাপার ধারাবাহিকতা যেমন দেখা যাবে, তেমনি খবর কিংবা বিজ্ঞাপনের পরিবর্তনও চাক্ষুষ করা যাবে। ফলে কেবল একুশ নয়, বরং এই সংকলন সময়েরও দলিলে রূপান্তরিত হয়েছে।

ছবি: হাল ফ্যাশন

প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৩: ৩৩
বিজ্ঞাপন