বৃষ্টি এল না, তবু ভিজল শহর: বকুলতলায় ঘনঘটা ২–এর আয়োজনে বর্ষার প্রাণভরা উদ্‌যাপন
শেয়ার করুন
ফলো করুন

কথা ছিল, সবাই একসঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজবে। সেই আহ্বানেই শুক্রবার সকাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলার দিকে হাঁটা ধরেছিলেন হাজারো মানুষ। কেউ পরেছেন সাদা শাড়ি, কেউ নীল বা সবুজ। ছেলেদের গায়ে পাঞ্জাবি।

আয়োজকদের অনুরোধ ছিল একটাই—ছাতা নয়, বর্ষাকে বরণ করতে আসুন খোলা আকাশের নিচে; কিন্তু আকাশ যেন একটু অভিমান করল। মেঘ ছিল, বাতাসে ছিল বৃষ্টির গন্ধ, ছিল অপেক্ষা। শুধু ঝরে পড়ল না একফোঁটা জল।

তবু দিন শেষে সবাই বলল, তারা ভিজেছে। তবে বৃষ্টিতে নয়, নাচের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা উচ্ছ্বাসে।

বিজ্ঞাপন

ঘনঘটার ডাক যেন উপেক্ষা করার নয়। এই শুক্রবার সকাল থেকেই সাদা, নীল আর সবুজের রঙে সেজে হাজারো মানুষ পা বাড়ান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বকুলতলার দিকে।

গন্তব্য ঘনঘটা ২। উদ্দেশ্য সবাই মিলে বর্ষাকে বরণ করে নেওয়া সমবেত নাচের উচ্ছ্বাসে। এটি ছিল ঘনঘটার দ্বিতীয় আয়োজন। এর আগের বছর অবশ্য ঘনঘটা ১-এ ঝুম বৃষ্টির দেখা মিলেছিল এই একই স্থানে।

বিজ্ঞাপন

ঢাকার ব্যস্ত নাগরিক জীবনে এমন দৃশ্য আজকাল খুব কমই দেখা যায়। যেখানে কোনো তারকা শিল্পীর কনসার্ট নয়, কোনো রাজনৈতিক সমাবেশ নয়, কোনো উৎসবের ছুটি নয়; শুধু নাচ দেখতে, বর্ষাকে অনুভব করতে আর একটুখানি সুন্দর সময়ের খোঁজে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেছেন বকুলতলায়। একুশে পদকপ্রাপ্ত নৃত্যশিল্পী ও কোরিওগ্রাফার অর্থি আহমেদ ড্যান্স একাডেমির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হলো ঘনঘটা–২। ৯০ মিনিটের এই আয়োজনে ৩ থেকে ৭০ বছর বয়সী তিন শতাধিক শিল্পী পরিবেশন করেন ১৬টি নৃত্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম এবং বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের গান ও সুরে মিশে যায় বর্ষার রূপ, মাটির গন্ধ আর মানুষের আবেগ।শিল্পী নির্ঝর চৌধুরীর পরিবেশনায় আল্লাহ মেঘ দে পানি দে গানের মূর্ছনায় দারুণ আবহ সৃষ্টি হয় শুরুতেই।

ঢাকার ব্যস্ত নাগরিক জীবনে এমন দৃশ্য আজকাল খুব কমই দেখা যায়। যেখানে কোনো তারকা শিল্পীর কনসার্ট নয়, কোনো রাজনৈতিক সমাবেশ নয়, কোনো উৎসবের ছুটি নয়; শুধু নাচ দেখতে, বর্ষাকে অনুভব করতে আর একটুখানি সুন্দর সময়ের খোঁজে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেছেন বকুলতলায়।

একুশে পদকপ্রাপ্ত নৃত্যশিল্পী ও কোরিওগ্রাফার অর্থি আহমেদ ড্যান্স একাডেমির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হলো ঘনঘটা–২। ৯০ মিনিটের এই আয়োজনে ৩ থেকে ৭০ বছর বয়সী তিন শতাধিক শিল্পী পরিবেশন করেন ১৬টি নৃত্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম এবং বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের গান ও সুরে মিশে যায় বর্ষার রূপ, মাটির গন্ধ আর মানুষের আবেগ।শিল্পী নির্ঝর চৌধুরীর পরিবেশনায় আল্লাহ মেঘ দে পানি দে গানের মূর্ছনায় দারুণ আবহ সৃষ্টি হয় শুরুতেই।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’। এরপর একে একে ‘আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিনে’, ‘পাগলা হাওয়ার বাদল-দিনে’, ‘এসো শ্যামল সুন্দর’, ‘রুম ঝুম’সহ প্রতিটি গানের পরিবেশনায় যেন দর্শকের মন আরও একটু করে ভিজে উঠেছে।

শেষটা ছিল আমরা ‘সবাই রাজা’ আর ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’র দারুণ কম্পোজিশনে আর এই দুটি গান যেন পুরো আয়োজনের দর্শনই তুলে ধরল। তা হলো একসঙ্গে পথ চলা, একসঙ্গে মানুষ হয়ে ওঠার সংকল্প।

অর্থি আহমেদের কাছে ঘনঘটা কেবল একটি নৃত্যানুষ্ঠান নয়; এটি বর্ষাকে নতুন করে দেখার, নতুন করে অনুভব করার এক সাংস্কৃতিক আহ্বান। তাঁর ভাষায়, নগরজীবনে বর্ষা এখন অনেকের কাছেই জলাবদ্ধতা, কাদা আর যানজটের প্রতীক। অথচ বাংলার সংস্কৃতিতে বর্ষা মানেই উৎসব, প্রেম, গান, কবিতা আর জীবনের নবজাগরণ। সেই হারিয়ে যাওয়া অনুভূতিকে খোলা আকাশের নিচে ফিরিয়ে আনতেই তাঁর এই প্রয়াস।
গত বছর প্রথম ঘনঘটার দিন বৃষ্টি হয়েছিল। এবারের আকাশে মেঘ ছিল; কিন্তু বৃষ্টি নামেনি। তবু অর্থির বিশ্বাস, শিল্পীদের নিবেদন আর দর্শকদের ভালোবাসাই সেদিন বকুলতলাকে ভিজিয়ে দিয়েছে।

আয়োজকদের ধারণা ছিল, দুই থেকে তিন হাজার মানুষ এলেই অনুষ্ঠান সফল হবে; কিন্তু বাস্তবতা সব হিসাব বদলে দেয়। বিস্মিত অর্থি আহমেদ বলছিলেন, আমরা দুই থেকে তিন হাজার মানুষের আয়োজন করেছিলাম; কিন্তু সামনে তাকিয়ে দেখছি, মানুষের সমুদ্র। শুধু প্রাঙ্গণ নয়, স্থানসংকুলান না হওয়ায় অনেকে ভেতরেই ঢুকতে পারেননি। দর্শকদের দীর্ঘ সারি গিয়ে পৌঁছেছিল শাহবাগ মোড় পর্যন্ত। বকুলতলার প্রতিটি কোণ, গাছের নিচে, দেয়ালের ধারে, সিঁড়িতে—যেখানে একটুখানি দাঁড়ানোর জায়গা মিলেছে, সেখানেই মানুষ। কেউ মুঠোফোনের ক্যামেরায় স্মৃতি ধরে রাখছেন, কেউ নিঃশব্দে পরিবেশনা উপভোগ করছেন, কেউ আবার নিজের অজান্তেই গানের সঙ্গে গুনগুন করছেন। ছোট্ট শিশুর হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছেন বাবা-মা, প্রবীণ দর্শকের চোখেও ছিল মুগ্ধতার দীপ্তি। মনে হচ্ছিল, এই শহর এখনো সৌন্দর্যের জন্য সময় বের করতে জানে।

যাঁরা ভিড়ের কারণে অনুষ্ঠান দেখতে পারেননি, তাঁদের কথাও ভাবছেন আয়োজকেরা। অর্থি আহমেদ জানান, এত মানুষের আগ্রহ তাঁদের নতুন করে ভাবাচ্ছে। যাঁরা ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকতে পারেননি, তাঁদের জন্য আলাদা করে আরেকটি আয়োজন করা যায় কি না, সেটিও তাঁরা বিবেচনা করবেন।
অর্থি আহমেদ ড্যান্স একাডেমির প্রশিক্ষক মুনিরা রহমানের চোখে সবচেয়ে বড় আনন্দ অন্য জায়গায়। তিনি বলেন, ‘যাঁরা একদম নতুন, যাঁদের হাতে এখানেই প্রথম নাচের হাতেখড়ি, তাঁদের যখন হাজারো মানুষের সামনে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নাচতে দেখি, তখন মনে হয় আমাদের পরিশ্রম সার্থক হয়েছে।’

আসলে ঘনঘটার সবচেয়ে বড় বিস্ময় ছিল মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষেরা। তাঁরা কেউ পেশাদার নৃত্যশিল্পী নন। কেউ চিকিৎসক, কেউ প্রকৌশলী, কেউ শিক্ষক, কেউ গবেষক, কেউ সাংবাদিক, কেউ সরকারি কর্মকর্তা, আবার কেউ গৃহিণী। এমন অনেকেও ছিলেন, যাঁরা জীবনে প্রথমবার কোনো মঞ্চে উঠেছেন। অর্থি আহমেদের বহুদিনের স্বপ্ন ছিল এমন একটি পরিসর তৈরি করা, যেখানে বয়স, শরীর কিংবা সামাজিক সংকোচ কাউকে আটকে রাখতে পারবে না। যেখানে ভুল করলে কেউ হাসবে না, কাউকে বিচার করা হবে না, শরীর নিয়ে কোনো কটাক্ষ থাকবে না। করোনাকালের সেই কঠিন সময়েই জন্ম নেয় তাঁর অ্যাডাল্ট বিগিনার্স কোর্সের উদ্যোগ। আজ সেখানে হাজারের বেশি মানুষ নাচ শিখেছেন, অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছেন আরও কয়েক হাজার। এই সংখ্যাগুলো যেন একটিই কথা বলে—সংস্কৃতি চর্চার ইচ্ছার কোনো বয়স হয় না।

তবে ঘনঘটা–২-এর সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক ছিল এর মানবিকতা। বর্ষা উদ্‌যাপনের পাশাপাশি  আয়োজনজুড়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য তহবিল সংগ্রহ করা হয়েছে। শিল্পীরা ব্যক্তিগতভাবে অনুদান দিয়েছেন, দর্শনার্থীরাও জাগো ফাউন্ডেশনের বুথে দাঁড়িয়ে সাধ্যমতো সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন। অর্থি আহমেদের বিশ্বাস, সংকটের সময়ে শিল্পীদের নির্লিপ্ত থাকার সুযোগ নেই। সহায়তার পরিমাণ বড় না হলেও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছাটাই সবচেয়ে বড়। সেই কারণে ঘনঘটা শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়ে থাকেনি; এটি মনে করিয়ে দিয়েছে, সংস্কৃতি কেবল বিনোদনের জন্য নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শক্তিও জোগায়।

এই আয়োজন দেখতে দুই মেয়ে সায়রা ও শানায়াকে নিয়ে এসেছিলেন হৃদ্‌রোগবিশেষজ্ঞ ডা. সাইদুর রহমান। অনুষ্ঠান শেষে তিনি বলছিলেন, ‘পয়লা বৈশাখ কিংবা বসন্ত উৎসবের অনেক আয়োজনেই এখন যেন কিছুটা যান্ত্রিকতার ছোঁয়া দেখি; কিন্তু এখানে এসে মনে হলো সত্যিই প্রাণের উৎসবে এসেছি। আমি চাই, আমার মেয়েরা ছোটবেলা থেকেই জানুক আমাদের সংস্কৃতি কত সমৃদ্ধ, কত প্রাণবন্ত।’ দিন শেষে বৃষ্টি নামেনি। তবু বকুলতলা থেকে ফিরে যাওয়া মানুষের মুখে ছিল অদ্ভুত এক প্রশান্তি। কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও তারা ভুলে গিয়েছিল নগরের ক্লান্তি, যানজট আর ব্যস্ততার হিসাব।

সব বর্ষা জল নিয়ে আসে না; কিছু বর্ষা আসে মানুষের ভিড়ে, কিছু আসে গানের সুরে, কিছু আসে নৃত্যের ছন্দে। আর কিছু বর্ষা নেমে আসে নিঃশব্দে প্রাণের বকুলতলার নিচে, হাজারো মানুষের একসঙ্গে সুন্দর হয়ে ওঠার ইচ্ছায়।
আজকের ব্যস্ত সময়ে বাঙালির জীবনে এমন প্রাণখোলা, অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্‌যাপন খুব বেশি দেখা যায় না। তাই বর্ষাকে নতুন করে মানুষের উৎসবে ফিরিয়ে আনার এই সাহসী ও হৃদয়ছোঁয়া উদ্যোগের জন্য অর্থি আহমেদ ড্যান্স একাডেমির নিঃসন্দেহে প্রাপ্য একরাশ আন্তরিক অভিনন্দন।

ছবি: মমিনুল ইসলাম মমিন, তানজির আহমেদ শুভ, আল আমিন আবু আহমেদ আশরাফ দোলন, শুভ দাশ রনি ও মাহমুদুল আমিন ।

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬, ১২: ৩০
বিজ্ঞাপন